মাছ খাওয়ার উপকারিতা অঢেল। মাছ প্রোটিনের এক চমৎকার উৎস। এতে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এ, ডি, বি১২ এবং আয়োডিন ও ক্যালসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ। নিয়মিত মাছ খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে এবং হাড় মজবুত হয়। কিন্তু তাই বলে সব মাছই শরীরের জন্য উপকারী নয়!
মাছ খাওয়ার যেমন সুফল আছে, তেমনি কিছু মাছ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। যেমন, বাজারে প্রায়শই কম দামে দেখা মেলে তেলাপিয়া মাছের। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, কৃত্রিম উপায়ে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ অনেক সময় টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানে ভরপুর থাকে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি এটি হাঁপানি ও অ্যালার্জিরও অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাই বাজারে যত কম দামেই পাওয়া যাক না কেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত শেওলা, উচ্ছিষ্ট খাবার কিংবা দূষিত বর্জ্য খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে এই মাছ।
‘জার্নাল অফ ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড ইনোভেটিভ রিসার্চ’-এর একটি গবেষণায় ড. নীলেশ সালভে ও ড. নমিতা বাটলে জানিয়েছেন, দূষিত জলাশয়ে চাষ করা তেলাপিয়া মাছে বিপজ্জনক মাত্রায় আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম এবং সিসার মতো ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিছু ধাতুর পরিমাণ মানুষের খাওয়ার জন্য নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়েও অনেক বেশি। গবেষকরা জানিয়েছেন, দূষিত তেলাপিয়া মাছ দীর্ঘদিন ধরে খেলে শরীরে এসব ক্ষতিকর ধাতু জমা হতে থাকে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষকদের একাংশের দাবি, অস্বাস্থ্যকর খামারের তেলাপিয়া মাছ খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া থেকে আমদানি করা কিছু তেলাপিয়া মাছের শরীরে মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান মিলেছে। গবেষকদের দাবি, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাছ চাষের সময় অনেক ক্ষেত্রে হাঁস, শুকর বা মুরগির বর্জ্য ও দেহাবশেষ খাবার হিসেবে দেওয়া হয়, যা মাছটিকে দ্রুত বড় করলেও বিষাক্ত করে তোলে। বিজ্ঞানীরা জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেলাপিয়া চাষের সময় অত্যধিক পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।
বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় তেলাপিয়া খামারে বিপুল পরিমাণে চাষ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব খামারে মানসম্মত খাবারের পরিবর্তে হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা দেওয়া হয়। এই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে রোগজীবাণু শরীরে বয়ে বেড়ায় তেলাপিয়া। আর সেই মাছ খেলে মানুষের হৃদরোগ, পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) ও হাঁপানির সমস্যা হতে পারে, এমনকি বেড়ে যায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খামারে উৎপাদিত তেলাপিয়া মাছে প্রাকৃতিক প্রোটিনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। উল্টো এদের শরীরে ‘ডিবুটিলিঙ্ক’ নামের এক প্রকার রাসায়নিক জমা হতে পারে, যা থেকে হাঁপানি ও অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উল্লেখ্য, প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস তৈরির ক্ষেত্রেও এই ডিবুটিলিঙ্ক ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া এই মাছের শরীরে ‘ডাইঅক্সিন’ নামের এক ধরনের রাসায়নিক থাকে। খামারের তেলাপিয়ার শরীরে এই ডাইঅক্সিনের মাত্রা সাধারণ মাছের চেয়ে প্রায় ১১ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের দাবি, এই ডাইঅক্সিন শরীরে প্রবেশ করলে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। পাশাপাশি খামারে চাষ করা তেলাপিয়া থেকে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ও কলমনারিসের মতো ব্যাকটিরিয়াঘটিত রোগ ছড়াতে পারে।
২০০৮ সালের একটি গবেষণা পত্র অনুযায়ী, তেলাপিয়া মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত ওমেগা-সিক্স শরীরে প্রবেশ করলে হাঁপানি, বাত ও প্রদাহজনিত অসুখ বাড়তে পারে। এটি রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা দেখা দেয়।
খুলনা গেজেট/রুএ

